বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
বিষয়ঃ মদ ও জুয়া
(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)
আয়াতে কারীমাহ্
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَإِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَاذَا يُنْفِقُونَ قُلِ الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
[البقرة: 219]
সরল অনুবাদ
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
[২] উপকারিতাসমূহের সম্পর্ক দুনিয়ার সাথে। যেমন, মদপানে সময়িকভাবে শারীরিক স্ফূর্তি, সানন্দ উদ্যম এবং কারো কারো মস্তিষ্ক তেজস্বীতাও আসে। যৌনশক্তি বৃদ্ধি লাভ করে। তাই তার ব্যবহার ব্যাপক হয়। অনুরূপ এর (মদের) ক্রয়-বিক্রয় বড় লাভদায়ক ব্যবসা। জুয়াতেও কখনো কখনো কেউ জিতে যায়, ফলে সে কিছু অর্থ লাভ করে। কিন্তু এই সমূহ উপকারিতা সেই সমূহ ক্ষতি ও ফাসাদের তুলনায় কিছুই নয়; যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও তার দ্বীন-ধর্মের উপর আসে। আর এই জন্যই বলা হয়েছে, "কিন্তু উভয়ের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক।" এই আয়াতে মদ ও জুয়াকে (পরিষ্কারভাবে) হারাম বলা না হলেও তার প্রাথমিক সূচনার উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এই আয়াত থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি এই জানা যায় যে, প্রত্যেক জিনিসের মধ্যে কিছু না কিছু লাভ থাকেই, তাতে তা যতই খারাপ জিনিস হোক না কেন। যেমন রেডিও, টিভি এবং এই ধরনের আরো আবিষ্কৃত আধুনিক জিনিস। মানুষ তার কিছু কিছু লাভের কথা উল্লেখ করে আত্মপ্রতারণা করে থাকে। কিন্তু বিবেচনা করা উচিত যে, লাভ ও নোকসানের মধ্যে কোনটার ভাগ বেশী। বিশেষতঃ দ্বীন, ঈমান এবং আখলাক-চরিত্রের দিক দিয়ে। যদি দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে তার নোকসান ও ক্ষতির দিক বেশী হয়, তাহলে সামান্য পার্থিব লাভের জন্য তা জায়েয সাব্যস্ত করা যাবে না।
[৩] এই অর্থের দিক দিয়ে এটা একটি নৈতিক নির্দেশ অথবা এই নির্দেশ ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ছিল। যাকাত ফরয হওয়ার পর এর উপর আমল আর জরুরী নয়। তবে উত্তম অবশ্যই বটে। কিংবা العَفو এর অর্থ হল, "যা সহজভাবে ও অনায়াসে হয় এবং অন্তরে ভারী অনুভূত না হয়।" ইসলাম অবশ্যই (আল্লাহর পথে) ব্যয় করার প্রতি বড় উৎসাহ প্রদান করেছে, তবে এ ব্যাপারে মধ্যপন্থার খেয়াল রেখে প্রথমতঃ স্বীয় অধীনস্থ ব্যক্তিদের দেখাশোনা এবং তাদের প্রয়োজন পূরণকে প্রাধান্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ এমন মুক্তহস্তে ব্যয় করতে নিষেধ করেছে, যাতে কাল তোমাকে ও তোমার পরিবারের লোকদেরকে অন্যের দ্বারস্থ হতে না হয়।
আয়াতে কারীমাহ্
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لَامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًّا غَفُورًا
[النساء: 43]
সরল অনুবাদ
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
[২] এর অর্থ এই নয় যে, পথে বা সফরে থাকা অবস্থায় পানি না পাওয়া গেলে অপবিত্র অবস্থাতেই নামায পড়ে নাও (যেমন অনেকে মনে করে), বরং অধিকাংশ উলামাদের নিকট এর অর্থ হল, অপবিত্র অবস্থায় তোমরা মসজিদে বসো না, তবে মসজিদ হয়ে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে যেতে পার। কোন কোন সাহাবীর ঘর এমন ছিল যে, সেখানে মসজিদের সীমানা হয়ে যাওয়া ছাড়া তাঁদের কোন উপায় ছিল না। আর এই কারণেই মসজিদ-সীমানার ভিতর হয়ে অতিক্রম করে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। (ইবনে কাসীর) মুসাফিরের বিধান তো পরে আসবে।
[৩] অর্থাৎ, অপবিত্র অবস্থাতেও নামায পড়বে না। কারণ, নামাযের জন্য পবিত্রতা অত্যাবশ্যক।
[৪] এখানের যাদের জন্য তায়াম্মুম বিধেয়, তাদের কথা বলা হচ্ছেঃ (ক) অসুস্থ ব্যক্তি বলতে এমন রোগীকে বুঝানো হয়েছে, যে ওযু করলে ক্ষতি অথবা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা করে। (খ) সফর বা মুসাফির সাধারণ শব্দ তাতে সফর লম্বা হোক বা সংক্ষিপ্ত; পানি না পেলে তায়াম্মুম করার অনুমতি আছে। পানি না পাওয়া গেলে তায়াম্মুম করার অনুমতি তো গৃহবাসী (অমুসাফির)-এরও আছে, কিন্তু রোগী ও মুসাফিরের এই ধরনের প্রয়োজন সাধারণতঃ বেশী দেখা দেয়, তাই বিশেষ করে তাদের জন্য এই অনুমতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। (গ) পেশাব-পায়খানার প্রয়োজন পূরণকারী এবং (ঘ) স্ত্রীর সাথে সহবাসকারীও যদি পানি না পায়, তাহলে তাদের জন্যও তায়াম্মুম করে নামায পড়ার অনুমতি আছে। আর তায়াম্মুম করার নিয়ম হল, পবিত্র মাটিতে একবার হাত দু'টিকে মেরে উভয় হাতকে কবজি পর্যন্ত বুলিয়ে নিয়ে (কনুই পর্যন্ত নয়) মুখে বুলিয়ে নিবে। নবী করীম (সাঃ) তায়াম্মুম সম্পর্কে বলেছেন, "উভয় হাত এবং মুখমন্ডলের জন্য একবার মাটিতে মারতে হবে।" (মুসনাদ আহমাদ ৪/২৬৩) [صَعِيْدًا طَيِّبًا] এর অর্থ হল, পবিত্র মাটি। মাটি থেকে উৎপন্ন প্রতিটি জিনিস নয়, যেমন অনেকে মনে করে। হাদীসে এটা আরো পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছেঃ
আয়াতে কারীমাহ্
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
[المائدة: 90]
সরল অনুবাদ
সংক্ষিপ্ত তাফসীর
কিন্তু সাম্প্রতিক কালের তথাকথিত কিছু 'চিন্তাবিদ' বলেন যে, 'মদ হারাম কোথায় বলা হয়েছে?!' এমন চিন্তা-বুদ্ধির জন্য তো রোদন করতে হয়। মদকে অপবিত্র বা ঘৃণ্য বস্তু ও শয়তানী বিষয় গণ্য করে তা হতে দূরে থাকতে আদেশ দেওয়া এবং দূরে থাকাকে সফলতার কারণ গণ্য করা ঐ 'মুজতাহিদ'দের নিকট হারাম হওয়ার জন্য (দলীল হিসাবে) যথেষ্ট নয়! যার মতলব হল, আল্লাহর নিকট অপবিত্র বস্তুও বৈধ, শয়তানী কাজও বৈধ। যে জিনিস থেকে আল্লাহ দূরে থাকতে বলেন, সে জিনিসও হালাল। যে কাজ সম্পাদন করাকে অসফলতা ও বর্জন করাকে সফলতার কারণ গণ্য করা হয়, তাও বৈধ! সুতরাং 'ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজিঊন।'
আয়াতে কারীমাহ্
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
[المائدة: 91]