বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ আল্লাহর পরীক্ষা গ্রহণ

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

[البقرة: 155]

সরল অনুবাদ

নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।
সূরার নাম — আল বাকারা | আয়াত নম্বর — ১৫৫

আয়াতে কারীমাহ্

وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ ۚ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۖ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ

[المائدة: 48]

সরল অনুবাদ

এর পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবের সমর্থক ও সংরক্ষকরূপে[১] আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুসারে তুমি তাদের বিচার-নিষ্পত্তি কর[২] এবং যে সত্য তোমার নিকট এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।[৩] তোমাদের প্রত্যেকের জন্য এক একটি শরীয়ত (আইন) ও স্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।[৪] ইচ্ছা করলে আল্লাহ তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য (তিনি তা করেননি)।[৫] অতএব সৎকর্মে তোমরা প্রতিযোগিতা কর, আল্লাহর দিকেই সকলের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছিলে, সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন।
সূরার নাম — আল মায়িদাহ | আয়াত নম্বর — ৪৮

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] প্রত্যেক আসমানী গ্রন্থ তার পূর্বোক্ত গ্রন্থের সত্যায়ন করে। অনুরূপ কুরআনও পূর্বোক্ত সমস্ত (আসমানী) গ্রন্থের সত্যায়ন করে। আর সত্যায়নের অর্থ হচ্ছে; সমস্ত গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কুরআন সত্যের সাক্ষ্যপ্রদানকারী হওয়ার সাথে সাথে সংরক্ষক, বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। অর্থাৎ পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলিতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে; কিন্তু কুরআন এ থেকে সুরক্ষিত আছে। আর এই জন্যই কুরআনের ফায়সালাই সত্য বিবেচিত হবে; কুরআন যাকে সঠিক বলে বিবেচনা করবে, সেটাই সঠিক হিসাবে গণ্য হবে। আর বাকী সবই বাতিল বলে বিবেচিত হবে。

[২] ইতিপূর্বে ৪২নং আয়াতে নবী (সাঃ)-কে এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছিল যে, তুমি ওদের ব্যাপারে বিচার-ফায়সালা কর অথবা না কর, সেটা তোমার ইচ্ছার উপর নির্ভর। কিন্তু এখন সে ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহের ব্যাপারে তুমি কুরআনের বিধান মোতাবেক ফায়সালা প্রদান কর।

[৩] এখানে আসলে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অবগত করানো হচ্ছে যে, আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ হতে বিমুখ হয়ে মানুষের খেয়াল-খুশী এবং মনগড়া মতবাদ ও আইন-কানুন অনুযায়ী ফায়সালা করা ভ্রষ্টতা। যার অনুমতি নবী (সাঃ)-কে প্রদান করা হয়নি, তাহলে অন্যরা কি করে এ কর্ম সম্পাদন করতে পারে ?

[৪] এর অর্থ হলো; পূর্বোক্ত শরীয়তসমূহ, যার মধ্যে গৌণ বিষয়ে (আংশিক) কিছু একে অপর থেকে পার্থক্য ছিল। এক শরীয়তে কোন জিনিস বৈধ (হালাল) ছিল; কিন্তু অন্য শরীয়তে তা অবৈধ (হারাম) ছিল। কোন শরীয়তে কোন বিষয় বড় কষ্টকর ছিল, পক্ষান্তরে অন্য শরীয়তে তা সহজ ছিল। কিন্তু দ্বীন সকলের একই ছিল। অর্থাৎ, তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর এই কারণেই সকলের দাওয়াতও এক ও অভিন্ন ছিল। এ বিষয়টি হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, "আমরা নবীগণ বৈমাত্রেয় ভাই ভাই; আমাদের সকলের দ্বীন অভিন্ন।" বৈমাত্রেয় ভাই বলা হয়; যাদের বাপ এক; কিন্তু মা ভিন্ন ভিন্ন। অর্থ হল, দ্বীন সকলের এক (তাওহীদ) ছিল; কিন্তু আইন ও পদ্ধতিগত কিছু পার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সমস্ত শরীয়ত রহিত হয়ে যায়। সুতরাং এখন শুধু একটাই দ্বীন ও একটাই শরীয়ত (যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য মান্য ও অপরিহার্য)।

[৫] অর্থাৎ, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর মুক্তির পথ তো শুধুমাত্র কুরআনেই আছে। কিন্তু এই মুক্তির পথ অনুসরণ করার জন্য আল্লাহ মানুষকে বাধ্য করেননি; অথচ তিনি ইচ্ছা করলে তা করতে পারতেন। কেননা তাতে পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না, অথচ তিনি মানুষকে পরীক্ষা করতে চান।

আয়াতে কারীমাহ্

أَحَسِبَ النَّاسُ أَن يُتْرَكُوا أَن يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ

[العنكبوت: 2]

সরল অনুবাদ

মানুষ কি মনে করে যে, ‘আমরা বিশ্বাস করি’ এ কথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হবে? [১]
সূরার নাম — আল আনকাবুত | আয়াত নম্বর — ২

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, মৌখিকভাবে ঈমান আনার পর তাদের কোন পরীক্ষা না নিয়েই এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে --এই ধারণা পোষণ করা ঠিক নয়। বরং তাদের জান-মালে বিপদ-আপদ দিয়ে এবং অন্যান্য সমস্যা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাতে আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা এবং মু'মিন ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়।

আয়াতে কারীমাহ্

وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ

[العنكبوت: 3]

সরল অনুবাদ

আমি অবশ্যই এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম;[১] সুতরাং আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী।
সূরার নাম — আল আনকাবুত | আয়াত নম্বর — ৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, এটি হল আল্লাহর একটি নিয়ম যা আদি কাল হতে চলে আসছে। সেই জন্য তিনি এই জাতির মু'মিনদেরও পরীক্ষা নেবেন; যেমন পূর্ববর্তী জাতির নেওয়া হয়েছে। এই সকল আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ সম্পর্কে যে বর্ণনা রয়েছে তাতে বলা হয়েছে যে, সাহাবা (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নিকট মক্কার কাফেরদের অত্যাচার ও উৎপীড়নের কথা অভিযোগ করে দু'আর আবেদন জানালেন, যাতে আল্লাহ তাঁদের সাহায্য করেন। তিনি বললেন, দুখঃ-কষ্ট ভোগ করা ঈমানদারদের ইতিহাসের একটি অংশ। তোমাদের পূর্বের কোন কোন মু'মিনকে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে দাঁড় করিয়ে করাত দিয়ে তাকে দু'ফাঁক করে দেওয়া হয়েছে। অনুরূপ লোহার চিরুনি দিয়ে তাদের শরীর হতে গোশত আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত অত্যাচার তাদেরকে হক পথ হতে ফেরাতে পারেনি। (বুখারীঃ আম্বিয়ার হাদীস অধ্যায়) আম্মার, তাঁর মাতা সুমাইয়্যাহ ও পিতা ইয়াসির, সুহায়েব, বিলাল ও মিকদাদ (রাঃ) ইত্যাদি সাহাবাদের উপর ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে যে অত্যাচারের পাহাড় ভাঙ্গা হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় আজও সংরক্ষিত আছে। এই পরিস্থিতি ও ঘটনাবলীই এসব আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার কারণ। পরন্তু আয়াতের সাধারণ অর্থের দিক দিয়ে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সকল ঈমানদারও এতে শামিল।

আয়াতে কারীমাহ্

وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۗ إِنَّ رَبَّكَ سَرِيعُ الْعِقَابِ وَإِنَّهُ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ

[الأنعام: 165]

সরল অনুবাদ

তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিনিধি করেছেন[১] এবং যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন, সে সম্বন্ধে পরীক্ষার উদ্দেশ্য তোমাদের কিছুকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করেছেন।[২] নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সত্বর শাস্তিদাতা এবং তিনি চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ১৬৫

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] অর্থাৎ, শাসক বানিয়ে কর্তৃত্ব দানে ধন্য করেছেন। অথবা একের পর অন্যকে তার উত্তরাধিকারী, স্থলাভিষিক্ত (খলীফা) বানিয়েছেন।

[২] অর্থাৎ, দরিদ্রতা-ধনাঢ্যতা, জ্ঞান-অজ্ঞতা এবং সুস্থতা-অসুস্থতা যাকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতেই তার জন্য রয়েছে পরীক্ষা।

আয়াতে কারীমাহ্

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ

[الأنبياء: 35]

সরল অনুবাদ

জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি।[১] আর আমারই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। [২]
সূরার নাম — আল আম্বিয়া | আয়াত নম্বর — ৩৫

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] কখনো দুঃখ-দুর্দশা দিয়ে, কখনো পার্থিব সুখ-শান্তি দিয়ে, কখনো সুস্বাস্থ্য ও প্রশস্ততা দিয়ে, কখনো অসুস্থতা ও সংকীর্ণতা দিয়ে, কখনো ধনবত্তা ও বিলাস-সামগ্রী দিয়ে, কখনো দরিদ্রতা ও অভাব দিয়ে পরীক্ষা করে থাকি। যাতে কে কৃতজ্ঞ ও কে অকৃতজ্ঞ, কে ধৈর্যশীল ও কে অধৈর্য তা আমি পরীক্ষা করি। কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির এবং অকৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যহীনতা আল্লাহর অসন্তুষ্টির বড় কারণ।

[২] ওখানে তোমাদের কর্মানুসারে ভাল-মন্দ প্রতিদান দেওয়া হবে। যারা সৎকর্মশীল তাদের জন্য উত্তম এবং যারা অসৎকর্মশীল তাদের জন্য মন্দ বিনিময় দেওয়া হবে।

আয়াতে কারীমাহ্

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ

[الملك: 2]

সরল অনুবাদ

যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদেরকে পরীক্ষা করবার জন্য; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে সর্বোত্তম?[১] আর তিনি পরাক্রমশালী, বড় ক্ষমাশীল।
সূরার নাম — আল মুল্‌ক | আয়াত নম্বর — ২

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] روح (আত্মা) একটি এমন অদৃশ্যমান বস্তু যে, যে দেহের সাথে তার সম্পর্ক বহাল থাকে, তাকে জীবিত বলা হয়। আর যে দেহ হতে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়, তাকে মৃত্যুর শিকার হতে হয়। জীবনের পর রয়েছে মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের ব্যবস্থা এই জন্য করেছেন, যাতে তিনি পরীক্ষা করতে পারেন যে, এই জীবনের সদ্ব্যবহার কে করে? যে এ জীবনকে ঈমান ও আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করবে, তার জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান এবং যে এর অন্যথা করবে, তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।

আয়াতে কারীমাহ্

وَكَذَٰلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لِّيَقُولُوا أَهَٰؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّن بَيْنِنَا ۗ أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّاكِرِينَ

[الأنعام: 53]

সরল অনুবাদ

এভাবে তাদের এক দলকে অন্য দল দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যেন তারা বলে যে, ‘আমাদের মধ্যে কি তাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন?’[১] আল্লাহ কি কৃতজ্ঞগণ সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত নন? [২]
সূরার নাম — আল আনআম | আয়াত নম্বর — ৫৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] ইসলামের সূচনায় বেশীরভাগ গরীব এবং ক্রীতদাস শ্রেণীর লোকেরাই মুসলমান হয়েছিল। এই জন্য এই জিনিসটাই কাফের নেতাদের পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ালো এবং তারা এই গরীবদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপও করত এবং যাদের উপর এদের কর্তৃত্ব চলত, তাদের উপর যুলুম-নির্যাতনের রোলার চালাত ও বলত যে, 'এরাই কি সেই লোক, যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন?' উদ্দেশ্য তাদের এই ছিল যে, ঈমান ও ইসলাম যদি বাস্তবিকই আল্লাহর অনুগ্রহ হত, তবে তা সর্বপ্রথম আমাদের উপর হত। যেভাবে তিনি অন্যত্র বলেন, {لَوْ كَانَ خَيْرًا مَا سَبَقُونَا إِلَيْهِ} "যদি এটা উত্তম জিনিস হত, তাহলে (তা গ্রহণ করার ব্যাপারে) এরা আমাদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারত না।" (সূরা আহকাফ ৪৬:১১) অর্থাৎ, এই দুর্বলদের পূর্বে আমরাই মুসলমান হয়ে যেতাম।

[২] অর্থাৎ, মহান আল্লাহ বাহ্যিক চাকচিক্য, মান-মর্যাদা এবং নেতাসুলভ ভাব-ভঙ্গিমার প্রতি লক্ষ্য করেন না। তিনি তো অন্তরের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করেন এবং এই দিক দিয়ে তিনি জানেন যে, কে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দা এবং সত্যকে চিনেছে কে? তাই তিনি যার মধ্যে কৃতজ্ঞতার গুণ দেখেছেন, তাকে ঈমানের সৌভাগ্য দানে ধন্য করেছেন। যেমন, হাদীসে এসেছে যে, "মহান আল্লাহ তোমাদের আকার-আকৃতি এবং তোমাদের মালধনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও তোমাদের আমলসমূহকে দেখেন।" (মুসলিম, বির্র্ অধ্যায়)

আয়াতে কারীমাহ্

فَإِذَا مَسَّ الْإِنسَانَ ضُرٌّ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلْنَاهُ نِعْمَةً مِّنَّا قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَىٰ عِلْمٍ ۚ بَلْ هِيَ فِتْنَةٌ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

[الزمر: 49]

সরল অনুবাদ

মানুষকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করলে সে আমাকে আহবান করে;[১] অতঃপর যখন আমি তাকে অনুগ্রহ প্রদান করি, তখন সে বলে, ‘আমি তো এ আমার জ্ঞানের মাধ্যমে লাভ করেছি।’[২] বস্তুতঃ এ এক পরীক্ষা,[৩] কিন্তু ওদের অধিকাংশই জানে না। [৪]
সূরার নাম — আয্‌-যুমার | আয়াত নম্বর — ৪৯

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এখানে মানুষের উল্লেখ 'জাতি' হিসাবে করা হয়েছে। অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষেরই এই অবস্থা যে, যখন তারা রোগ, অভাব-অনটন অথবা অন্য কোন সমস্যার শিকার হয়, তখন তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এবং তার সামনে কাকুতি-মিনতি করে।

[২] অর্থাৎ, নিয়ামত লাভ করার সাথে সাথেই অবাধ্যতা ও ধৃষ্টতার পথ অবলম্বন করে নেয় এবং বলে যে, এতে আল্লাহর আবার অনুগ্রহ কি? এ তো আমার পারদর্শিতার ফল। অথবা যে জ্ঞান ও দক্ষতা আমার রয়েছে, তারই মাধ্যমে এসব নিয়ামত অর্জিত হয়েছে। কিংবা আমি জানতাম যে, দুনিয়াতে এই সমস্ত জিনিস আমি পাব। কেননা, আল্লাহর নিকট আমার সম্মান অনেক।

[৩] অর্থাৎ, ব্যাপার তা নয়, যা তুমি মনে করছ অথবা বর্ণনা করছ। বরং এই নিয়ামতগুলো তোমার জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। এই দেখার জন্য যে, তুমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছ, না অকৃতজ্ঞ হচ্ছ।

[৪] এই কথা যে, এটা আল্লাহর পক্ষ হতে অবকাশ ও পরীক্ষা।