বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বিষয়ঃ মানুষ ও জিন

(নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত-এর তরজমা ও তাফসীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

[الذاريات: 56]

সরল অনুবাদ

আমি সৃষ্টি করেছি জ্বিন ও মানুষকে কেবল এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদত করবে। [১]
সূরার নাম — আয-যারিয়াত | আয়াত নম্বর — ৫৬

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এই আয়াতে আল্লাহ তাঁর বিধিগত (শরয়ী) ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছেন, যা তিনি ভালবাসেন ও চান। আর তা হল, সমস্ত মানুষ ও জ্বিন কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং আনুগত্যও শুধু তাঁরই করবে। এর সম্পর্ক যদি তাঁর সৃষ্টিগত ইচ্ছার সাথে হত, তবে কোন মানুষ ও জ্বিন আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিমুখতা অবলম্বন করার কোন ক্ষমতাই রাখত না। অর্থাৎ, এই আয়াতে সকল মানুষ ও জ্বিনকে জীবনের সেই উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করানো হয়েছে, যেটাকে তারা ভুলে গেলে পরকালে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসিত হবে এবং এই পরীক্ষায় তারা অসফল গণ্য হবে, যাতে মহান আল্লাহ তাদেরকে ইচ্ছা ও এখতিয়ারের স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছেন।

আয়াতে কারীমাহ্

فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ

[الرحمن: 13]

সরল অনুবাদ

অতএব (হে মানুষ ও জ্বিন সম্প্রদায়!) তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে মিথ্যাজ্ঞান করবে?[১]
সূরার নাম — আর রহমান | আয়াত নম্বর — ১৩

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এ সম্বোধন মানুষ ও জ্বিন উভয়কেই করা হয়েছে। মহান আল্লাহ তাঁর নিয়ামতসমূহ গনিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করছেন। আর এর বারবার পুনরাবৃত্তির ব্যাপারটা এমন ব্যক্তির মত, যে কারো প্রতি অব্যাহতভাবে অনুগ্রহ করে; কিন্তু সে তা অস্বীকার করে। যেমন বলে, আমি তোমার অমুক কাজটা করে দিয়েছি, তুমি কি তা অস্বীকার করছ? অমুক জিনিসটা তোমাকে দিয়েছি, তোমার কি স্মরণে নেই? অমুক অনুগ্রহটা তোমার প্রতি আমি করেছি, তোমার কি আমার ব্যাপারে একটুও খেয়াল নেই? (ফাতহুল ক্বাদীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَٰلِكَ ۖ كُنَّا طَرَائِقَ قِدَدًا

[الجن: 11]

সরল অনুবাদ

এবং আমাদের কতক সৎকর্মপরায়ণ এবং কতক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী। [১]
সূরার নাম — আল জ্বিন | আয়াত নম্বর — ১১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] قِدَدٌ অর্থ কোন বস্তুর খন্ড। صَارَ القَوْمُ قِدَدًا ঐ সময় বলা হয়, যখন তাদের অবস্থা এক অপর থেকে ভিন্ন (খন্ড-খন্ড) হয়। অর্থাৎ, আমরা বিভিন্ন দলে এবং বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত হয়ে আছি। অর্থাৎ, জ্বিনদের মধ্যেও মুসলিম, কাফের, ইয়াহুদী ও অগ্নিপূজক ইত্যাদি রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এদের মধ্যেও মুসলিমদের মত ক্বাদারিয়াহ, মুরজিয়াহ, এবং রাফেযাহ ইত্যাদি ফির্কা রয়েছে। (ফাতহুল ক্বাদীর)

আয়াতে কারীমাহ্

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِّنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ ۖ لَهُمْ قُلُوبٌ لَّا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَّا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَّا يَسْمَعُونَ بِهَا ۚ أُولَٰئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ

[الأعراف: 179]

সরল অনুবাদ

আর আমি তো বহু জ্বিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি;[১] তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দর্শন করে না এবং তাদের কর্ণ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শ্রবণ করে না। এরা চতুষ্পদ জন্তুর ন্যায়; বরং তা অপেক্ষাও অধিক বিভ্রান্ত![২] তারাই হল উদাসীন।
সূরার নাম — আল আরাফ | আয়াত নম্বর — ১৭৯

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এর সম্পর্ক তকদীরের সাথে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষ ও জ্বিনের ব্যাপারে আল্লাহর জানা ছিল যে, পৃথিবীতে গিয়ে তারা ভাল করবে না মন্দ করবে, সেই মত তিনি লিখে দিয়েছেন। এখানে ঐ সকল দোযখবাসীদের কথা উল্লিখিত হয়েছে, যারা আল্লাহর পূর্বজ্ঞান অনুযায়ী দোযখবাসী হওয়ারই কাজ করবে। পরবর্তীতে তাদের আরো কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে যে, যাদের মধ্যে এ সকল জিনিস এভাবে পাওয়া যাবে, যার বর্ণনা এখানে দেওয়া হয়েছে, জানতে হবে তাদের পরিণাম হবে মন্দ。

[২] অর্থাৎ, অন্তর, চোখ, কান এগুলি মহান আল্লাহ এই জন্য দান করেছেন, যাতে মানুষ তার দ্বারা উপকৃত হয়ে নিজ প্রভুকে চিনতে পারে, তার নিদর্শনসমূহ লক্ষ্য করে এবং সত্যের বাণী মন দিয়ে শোনে। কিন্তু যে ব্যক্তি ঐ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা উপকার নেয় না, যেন উপকার না নেওয়ার কারণে সে পশুর মত; বরং তার থেকেও অধম। কারণ পশুরা নিজের লাভ- নোকসান কিছুটা বুঝে। উপকারী জিনিস হতে উপকার নেয় এবং ক্ষতিকারক জিনিস হতে দূরে থাকে। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত হতে বিমুখতা প্রকাশকারী ব্যক্তির মধ্যে এই পার্থক্য করার শক্তিই শেষ হয়ে যায় যে, কোনটি তার জন্য লাভদায়ক, আর কোনটি ক্ষতিকারক। আর সেই কারণেই পরবর্তী বাক্যে তাদেরকে গাফিল বা উদাসীন বলা হয়েছে।

আয়াতে কারীমাহ্

سَنَفْرُغُ لَكُمْ أَيُّهَ الثَّقَلَانِ

[الرحمن: 31]

সরল অনুবাদ

হে মানুষ ও জ্বিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের (হিসাব-নিকাশের) জন্য অবসর গ্রহণ করব। [১]
সূরার নাম — আর রহমান | আয়াত নম্বর — ৩১

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

[১] এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর অবসর বা অবকাশ নেই। বরং (মানুষের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী) এটা একটি কথার কথা বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য ধমক ও ভীতি-প্রদর্শন; অর্থঃ মনোনিবেশ করব। ثَقَلاَنِ (মানুষ ও জ্বিনকে) এই কারণে বলা হয়েছে যে, তাদের উপর শরীয়তের সমস্ত কিছুর ভার ও দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। পক্ষান্তরে এই ভার ও বোঝ থেকে অন্য সৃষ্টি মুক্ত।