আসসালামু আলাইকুম স্যার। আমি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত আছি, আমি ১২ বছর চাকরি সম্পূর্ণ করেছি। আমি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করতে চাইলে অফিসার আমাকে কোনো সুযোগ সুবিধা ছাড়া চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করতে বলেন অথবা চাকরি চালিয়ে যেতে বলেন।
আমি সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী যে পেনশন বা সুযোগ সুবিধা পাওয়ার কথা, তারা আমাকে সেই সকল সুযোগ সুবিধা দিতে চাচ্ছে না। আমার প্রাপ্য বুঝে পাওয়ার জন্য ট্রাস্ট ব্যাংক হতে ১০ লক্ষ টাকা গৃহ নির্মাণ ঋণ নিতে চাচ্ছি। কিন্তু সুদ মুসলমানদের জন্য আল্লাহ হারাম করেছেন, তাই আমি সুদ খেতে চাচ্ছি না।
পেনশন বা হক বুঝে নেওয়ার জন্য ট্রাস্ট ব্যাংক হতে গৃহ নির্মাণের জন্য ১০ লক্ষ টাকা লোন নিয়ে পেনশনের জন্য আবেদন করবো। যতদিন পেনশন দিবে না, সেই সময় আমাকে সুদসহ মাসে মাসে কিস্তি দিতে হবে।
আমার প্রশ্নগুলো হলো:
১. আমি পেনশন বুঝে নেওয়ার জন্য ঋণ নিয়ে সুদ দিলে কি গুনাহ হবে? এবং হালাল পন্থায় কি করতে পারি?
২. ট্রাস্ট ব্যাংকের ইসলামী শাখা থেকে গৃহ নির্মাণ লোন নিলে কি জায়েজ হবে?
৩. ট্রাস্টের সুদি শাখা থেকে ১০ লক্ষ টাকা লোন নিলে সেই টাকা যদি আবার ইসলামী অথবা অন্য কোনো ব্যাংকে ডিপোজিট করে রাখি, সেই লাভ নিজে না খেয়ে নিজের বেতন হতে মূল কিস্তির টাকা আর সুদটা যদি ডিপোজিট লাভের টাকা থেকে শোধ করি তাহলে কি জায়েজ হবে? আমি সুদ খাব না। পেনশন পাওয়ার সাথে ট্রাস্ট ব্যাংকের লোন পরিশোধ করে দিব আর ডিপোজিট ভেঙে দিব ইনশাআল্লাহ।
আমার উদ্দেশ্য হলো, আমার স্ত্রী সন্তান আছে, তাদের হক নষ্ট করে পেনশন ছাড়া চাকরি ছাড়তে চাই না। সাথে সাথে হালাল রিজিক খেতে চাই, আমার নিজের হক বুঝে নিতে চাই। এখন আমার করণীয় কী বলবেন প্লিজ।
1 Answer
সম্মানীত প্রশ্নকারী (সামরিক কর্মকর্তা, ঢাকা সেনানিবাস),
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আপনার দীর্ঘ ১২ বছরের দেশসেবা এবং হালাল উপার্জনের প্রতি আপনার এই ঐকান্তিক আগ্রহ ও সুদের প্রতি ঘৃণাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। বর্তমান সময়ে নিজের ন্যায্য পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও হালাল-হারামের পরোয়া করা তাকওয়ার একটি বড় নিদর্শন। আপনার স্ত্রী-সন্তানের হকের প্রতি আপনার সচেতনতাও প্রশংসনীয়। আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর হানাফি ফিকহ ও শরীয়তের দলিলাদির আলোকে নিচে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো:
১ম প্রশ্নের উত্তর: পেনশন আদায়ের উদ্দেশ্যে সুদি ঋণ নেওয়া এবং হালাল পন্থা
আপনার চাকরির বিধি অনুযায়ী পেনশন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়া আপনার ন্যায্য ও আইনি অধিকার। কিন্তু একটি বৈধ ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের কৌশল হিসেবে সুদি ঋণের আশ্রয় নেওয়া ইসলামী শরীয়তে সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। শরীয়তের নিয়মানুযায়ী জীবন রক্ষাকারী চরম নিরুপায় অবস্থা (যেমন- চরম ক্ষুধায় মৃত্যুর উপক্রম হলে) ছাড়া হারাম বস্তু গ্রহণ করা জায়েজ হয় না। আপনার পেনশন পাওয়া অত্যন্ত জরুরি হলেও, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন ‘চরম বাধ্যবাধকতা’ (ইযতিরার)-এর পর্যায়ে পড়ে না যার কারণে সুদের মতো একটি কবিরা গুনাহ ও আল্লাহর সাথে যুদ্ধতুল্য অপরাধ (সূরা বাকারাহ: ২৭৯) সাময়িকভাবে বৈধ হয়ে যাবে।
শরয়ী দলিল:
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা বাকারাহ: ২৭৫)
হাদিসের দলিল:
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের চুক্তিপত্র লেখক এবং এর সাক্ষীদ্বয়ের উপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, এরা সবাই সমান (পাপের ক্ষেত্রে)।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৫৯৮)
হালাল পন্থায় করণীয়:
- প্রশাসনিক ও আইনিভাবে আপনার অধিকার আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যান। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট আইনি দপ্তরে আবেদন করুন।
- পেনশন না পাওয়া পর্যন্ত আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ‘করজে হাসানাহ’ (সুদমুক্ত ঋণ) নেওয়ার চেষ্টা করুন।
- চাকরি ছাড়ার আগে বিকল্প হালাল আয়ের উৎস বা ব্যবসার চেষ্টা করুন।
২য় প্রশ্নের উত্তর: ইসলামী শাখা থেকে গৃহ নির্মাণ ঋণ নেওয়া
ট্রাস্ট ব্যাংক বা অন্য যেকোনো ব্যাংকের ‘পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শাখা’ থেকে শরীয়াহ কমপ্লায়েন্ট পদ্ধতিতে গৃহ নির্মাণ বিনিয়োগ নেওয়া জায়েজ হবে।
ব্যাখ্যা: ইসলামী ব্যাংকগুলো সাধারণত গৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে সরাসরি নগদ টাকার ঋণ দেয় না। তারা ‘শিরকাতুল মিল্ক’ (যৌথ মালিকানা) বা ‘ডিমিনিশিং মুশারাকা’ (ক্রমহ্রাসমান অংশীদারিত্ব) পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ, ব্যাংক এবং গ্রাহক যৌথভাবে বাড়ির মালিক হয় এবং গ্রাহক ধীরে ধীরে ব্যাংকের অংশ কিনে নেওয়ার মাধ্যমে একসময় সম্পূর্ণ বাড়ির মালিক হয়ে যায়।
শর্ত: উক্ত শাখার একটি নির্ভরযোগ্য ‘শরীয়াহ সুপারভাইজরি বোর্ড’ থাকতে হবে এবং চুক্তিপত্রটি সম্পূর্ণ শরীয়াহ মোতাবেক হতে হবে। যদি এই শর্তগুলো পালিত হয়, তবে সেখান থেকে গৃহ নির্মাণ সুবিধা গ্রহণ করা আপনার জন্য জায়েজ।
৩য় প্রশ্নের উত্তর: সুদি ঋণ নিয়ে অন্য জায়গায় ডিপোজিট করে সুদের কিস্তি পরিশোধের প্রস্তাবনা
আপনার প্রস্তাবিত এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ এবং হারাম। এটি কোনোভাবেই শরীয়তসম্মত নয়। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে:
- চুক্তিতেই গুনাহ: শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধুমাত্র সুদের টাকা পকেটে ঢোকানো বা পকেট থেকে দেওয়াই হারাম নয়, বরং সুদি চুক্তিতে সই করা বা আবদ্ধ হওয়াটাই (Contract of Riba) সরাসরি হারাম। আপনি যখন সুদি শাখা থেকে ঋণ নিচ্ছেন, তখনই আপনি একটি সুদি চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন, যা পূর্বোক্ত মুসলিম শরীফের হাদিস অনুযায়ী অভিশপ্ত কাজ।
- হারাম দিয়ে হারাম পরিশোধ: আপনি সুদি ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকে তা জমা রেখে যে লাভ পাবেন, তা দিয়ে মূল ঋণের সুদ পরিশোধ করতে চাচ্ছেন। ইসলামের নীতি হলো, হারাম পন্থায় উপার্জিত অর্থ দিয়ে আরেকটি হারাম বা পাপের কাজ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়বিধা নেই।
- সুদ প্রদান: আপনি সুদ ‘খাচ্ছেন না’ ঠিক, কিন্তু আপনি সুদ ‘দিচ্ছেন’ এবং সুদের একটি প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তিতে স্বেচ্ছায় প্রবেশ করছেন। ইসলামে সুদ খাওয়া এবং সুদ দেওয়া—উভয়টিই সমান অপরাধ। তাই এই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে সুদের গুনাহ থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ শরীয়তে নেই।
উপসংহার ও আপনার প্রতি পরামর্শ
আমরা বুঝতে পারছি আপনি অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তবে মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং হারাম থেকে বাঁচার জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে বা কষ্ট সহ্য করে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম বিকল্প দান করেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন:
“আর যে আল্লাহকে ভয় করে (তাকওয়া অবলম্বন করে), আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দান করেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
তাই সুদের মতো ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে হালালের ওপর অবিচল থাকুন। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন এবং বৈধ পথে আপনার অধিকার আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যান। ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আপনার রিজিক ও পেনশনের উত্তম ফয়সালা করে দেবেন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং আপনার রিজিক ও পরিবারে বরকত দান করুন। আমীন।
উত্তরে,
মুফতি মুহসিন উদ্দিন
ফাউন্ডার ডিরেক্টর ও এডিটর